nadim 98
December 14, 2010, 05:02 PM
[বাংলা]ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সফলতম বোলার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে নিজেকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। আবদুর রাজ্জাক বলেছেন এই সাফল্য ও এর পূর্বাপর নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফুল ইসলাম
জিম্বাবুয়ে সিরিজটা তো আপনার দুহাত ভরিয়ে দিল, অথচ এর আগের বছরটা খুব বাজে কেটেছে। ১৮ ম্যাচে উইকেট ছিল মাত্র ১৬টি...
আবদুর রাজ্জাক: আসলে আমি ওসব নিয়ে বেশি ভাবিনি। খেলোয়াড়দের জীবনে এটা খুবই স্বাভাবিক—ভালো সময় যেমন আসে, খারাপ সময়ও আসে। তা ছাড়া আমি এসব হিসাবও করি না। বিশ্বাস করুন, ১৮ ম্যাচে ১৬ উইকেট না হয়ে যদি ৪০ উইকেট হতো, তাহলেও আমার হিসাব থাকত না। এই যে এই সিরিজে এত রেকর্ড করলাম, আপনারা না বললে আমি জানতামও না। আমি শুধু দলের জন্য অবদান রাখতে চাই।
এ কাজটাই তো ঠিকমতো করতে পারছিলেন না, এতে তো খারাপ লাগার কথা?
রাজ্জাক: হ্যাঁ, মনে হয়েছে আমি ঠিকমতো পারছি না। কিন্তু এটাও ভেবেছি, এখন পারছি না মানে সামনে যে পারব না তা তো নয়। আমার মনে হয় ক্রিকেটে জটিল চিন্তা করা মানে নিজেকে বিপদে ফেলা। নিজের ওপর প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিলে খুব কমই সফল হওয়া যায়। আমি তাই সবকিছু খুব সহজভাবে দেখি। আর যে ১৮ ম্যাচের কথা বললেন, ওই সময়টা আমি আসলে একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে, তবে বিশ্বাস ছিল সুসময় ফিরে আসবেই।
এ প্রসঙ্গেই আসতাম। এই সিরিজের বোলিং দেখে মনে হলো, বোলিং অ্যাকশন শোধরানোর পর আপনার বোলিংয়ে আরও বৈচিত্র্য যোগ হয়েছে। ফ্লাইট-লুপ এসব আগে এত ভালো ছিল না, এত টার্নও পেতেন না...
রাজ্জাক: হ্যাঁ, এটাই বলছিলাম যে মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে। তার মানে এই না যে এখন যেমন উইকেট পাচ্ছি, এভাবে পেতেই থাকব। খারাপ সময় আবারও আসতে পারে। লোকজন ভালো সময় ভালো বলবে, খারাপ সময়ে খারাপ। আমাদের ওসব নিয়ে ভাবলে চলে না, নিজেদের কাজটা করে যেতে হয়।
অনেকবার বলেছেন, তবুও আপনার সঙ্গে কথা বললে বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটির ব্যাপারটা তো আসবেই। কেমন লেগেছে তখন?
রাজ্জাক: এই কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। তবে দুবারের অনুভূতিতে একটু পার্থক্য ছিল। প্রথমবার খুব অবাক হয়েছিলাম। তখন ১৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হাত বাঁকানোর নিয়ম ছিল না। ঘরোয়া লিগে দু-একজন আম্পায়ার কখনো কখনো বলেছেন, আমার নিজের কিন্তু কখনো সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি। তবে নিশ্চয়ই ঝামেলা ছিল, না হলে তো আর অভিযুক্ত হতাম না! ১৫ ডিগ্রির নিয়ম করার পর আমার জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। কারণ আমার ৯-১০ ডিগ্রির বেশি বাঁকত না। কঠিন সময় গেছে আসলে দ্বিতীয়বার। গড়ে ১৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকত, কখনো কখনো ২৩-২৪-২৮ ডিগ্রি! নিজেরই সন্দেহ হচ্ছিল, এবার ফিরতে পারব তো? পরে জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম, আমি এটা শুধরে আবার জাতীয় দলে একটা ম্যাচ হলেও খেলব। তারপর বাদ পড়ে গেলে যাব, কোনো দুঃখ থাকবে না।
এসব সময়ে মানসিক সমর্থনটাও তো বড় ব্যাপার। সেটি কার কাছ থেকে বেশি পেয়েছেন?
রাজ্জাক: নিঃসন্দেহে সালাউদ্দিন ভাই (জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ)। বিশ্বাস করবেন না, সারা দিন আমার সঙ্গে লেগে থাকতেন। এমনকি সন্ধ্যার পরও ফোনে এটা-ওটা পরামর্শ দিয়ে যেতেন। ওই সময় আমার কিছুই ভালো লাগত না। ওই চারটা মাস যে কীভাবে গেছে, কাউকে বোঝাতে পারব না। ক্রিকেট না খেলে ঘরে বসে থাকব, এটা আমি চিন্তাই করতে পারছিলাম না। ওই সময় সালাউদ্দিন ভাই যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন, তাঁর মতো একজন অসাধারণ মানুষের পক্ষেই কেবল তা সম্ভব।
ওই সময়ে বা অন্য কোনো সময় মনে হয়েছে, একজন স্পিন কোচ থাকলে ভালো হতো?
রাজ্জাক: দেখুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সালাউদ্দিন ভাই অনেক জানেন। উনি যেসব জানেন বা করতে বলেন, আমরা আসলে ওটাই এখনো ঠিকমতো করতে পারিনি। আগে তো উনারগুলো শিখি, তারপর না-হয় এর চেয়ে বেশি জানা কারও কাছ থেকে শিখব। স্পিন কোচের কথা কখনো তাই মনে হয়নি। তা ছাড়া উনাকে যখন, যেভাবে ডাকি, পাশে পেয়ে যাই। উনার সঙ্গে বোঝাপড়াটা এমন যে একটু কিছু বললেই পুরোটা বুঝে ফেলি। আসলে বিকেএসপিতে অনেক ছোট থেকেই তাঁর সঙ্গে আছি বলেই হয়তো এই বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। আমাকে উনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
বিকেএসপির প্রসঙ্গে আসার আগে আরেকটু আগে ফিরে যাই, ক্রিকেটে হাতেখড়ি হলো কীভাবে?
রাজ্জাক: শুরু করেছি ক্লাস ফোর-ফাইভে, টেনিস বলে। তখন ব্যাটসম্যান ছিলাম। ওই বয়সেই আমাদের পাড়ার ক্লাবে খেলেছি, মনে হয় ভালোই খেলতাম! আমার জন্য আলাদা থাকত একটা ছোট ব্যাট। এভাবে খেলতে খেলতেই একদিন বিকেএসপিতে গেলাম।
বিকেএসপিতে যাওয়ার কাহিনিটা একটু শোনা যাক...
রাজ্জাক: তসলিম চাচা নামে আমার এক চাচা ছিলেন, উনিই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমাকে ভর্তি করান। সেই সময় নিভৃত গ্রামে বিজ্ঞাপন দেখে ফরম পূরণ করে পাঠানো চাট্টিখানি কথা নয়, তসলিম চাচার কাছে আমি অনেক ঋণী। ফরম পূরণ করার সময় মজার একটা ঘটনা হয়েছিল। পাসপোর্ট সাইজ ছবি দিতে হবে, স্টুডিওতে গিয়ে দেখি কারেন্ট নেই। ছবি তোলার মতো আলো নেই। কিন্তু ফরম ওই দিনই পাঠাতে হবে। পরে বাইরে এসে চাচা একটা কালো কাপড় আমার পেছনে ধরল, আমি চেয়ারে বসলাম, ছবি তোলা হলো। পরে পরীক্ষা দিয়ে চান্সও পেয়ে গেলাম।
বিকেএসপিতে কি ব্যাটসম্যান হিসেবেই ঢুকেছিলেন?
রাজ্জাক: ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পেস বোলিংও করতাম। তখন কোচ ছিলেন ইমরান স্যার-ফাহিম স্যার। ইমরান স্যার চাইতেন ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পেস বোলিং করি। ফাহিম স্যার চাইতেন ব্যাটসম্যান কাম স্পিনার হই। তখন ঘাসে খেলা হলে সবাই স্পিন বোলিং করতাম। ঘাসের খেলায় প্রথম স্পিন বল করে ৫ ওভারে ৪ রান দিয়ে ৫ উইকেট পেয়েছিলাম। তারপর থেকে ফাহিম স্যার বলতেন, তুমি স্পিনই করো। আমি এটা শুনলেই ভয় পেতাম, ‘স্যার কী বলে, জীবনে কখনো স্পিন করিইনি, স্পিনার হব কীভাবে!’
তো স্পিনার হলেন কীভাবে?
রাজ্জাক: আস্তে আস্তে হয়ে গেছি। বিকেএসপিতেই একবার ইনজুরড হওয়ায় পেস বোলিং করতে পারছিলাম না। তার পরও দলে ছিলাম, কারণ ওপেনিং-ওয়ান ডাউনে ব্যাট করতাম। কিন্তু দলে বেশি বোলার নেই; অধিনায়ক বলল, তুই স্পিনই কর। এই শুরু। ক্লাস নাইনে থাকতে থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইং খেলেছিলাম সিসিএসের হয়ে। প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরিও করেছিলাম। ১৯৯৯ সালে প্রথম বিভাগ আজাদ স্পোর্টিংয়ে। তখনো আমি ওপেনিং ব্যাটসম্যান আর পেস বোলার। বিকেএসপি থেকে বের হয়ে ২০০২-০৩ জাতীয় লিগ খেলি খুলনার হয়ে, চার মাচে একটা ফিফটি আর একটা ৪৫ ছিল। ভালোভাবে স্পিন শুরু করলাম বিমানে এসে, পুরোপুরি স্পিনার হলাম পরের বছর ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে। বিমানে গিয়ে চোট পেয়েছিলাম। অধিনায়ক ফারুক ভাই বলল, ‘আপাতত ম্যাচ খেলার দরকার নেই। তুই বিশ্রাম নে আর নেটে স্পিন কর।’ তখন স্পিনে জোর দিলাম। পরের বছর ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে ব্যাটিংই পেতাম না, এ জন্য বোলিংয়েই মন দিলাম। তবে এখনো আমি মনে করি না ্ব্যাট হাতে ভালো কিছু করার সময় শেষ হয়ে গেছে।
প্রথম জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর অনভূতিটা কেমন ছিল?
রাজ্জাক: জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বগুড়ায় ‘এ’ দলের সিরিজ দেখতে গিয়েছিল ডেভ (হোয়াটমোর)। প্রথম ম্যাচ দেখেই নাকি ম্যানেজার-নির্বাচকদের বলে রেখেছিল আমাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দলে নিতে চায়। ওই দিন খেলা শেষে রোকন ভাই (আল-শাহরিয়ার), রাজীব (শাহাদাত হোসেন), অলকরা (কাপালি) বলছিল, তুই তো চান্স পেয়ে গেছিস। আমি ভাবলাম, স্রেফ ফাজলামো। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকায় ৭ উইকেট পেলাম, পরের ম্যাচে ৪ উইকেট, মনে হচ্ছিল ডাক পেতে পারি। একদিন কোনো এক বোর্ড কর্মকর্তার ফোন পেলাম। বলল তোমাকে দলে নেওয়া হয়েছে, ঠিকমতো অনুশীলন করো। এটুকু বলেই রেখে দিল, নাম-ধাম কিছু বলল না। তখনো তাই বিশ্বাস হয়নি। পরদিন পত্রিকায় নাম দেখে কেমন যে লেগেছিল, সেটা বলে বোঝাতে পারব না।
এরপর থেকে আপনার অভিযান তো আমরা মোটামুটি জানিই। একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। হাবিবুল-রফিকদের দলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন আপনি, এই দলেরও। দুটো দলের তুলনা কীভাবে করবেন?
রাজ্জাক: সত্যি বলতে তখন একটু রিল্যাক্সড ক্রিকেট হতো, এখন আর সেই সুযোগ নেই। এখন যেমন একটা সিরিজ হলেই আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে জয়, বিশেষ করে দেশের মাটিতে। তখন এতটা চাপ ছিল না। একটা-দুটো জয় পেতাম অনেক দিন পরপর। এখনো যে টানা জিতেই যাচ্ছি, তা নয়। তবে প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক, ধাপে ধাপে আমাদের উন্নতি হয়েছে। আমার কাছে এই ধাপে ধাপে উন্নতির ব্যাপারটা খুবই ভালো লাগে। আমরা কোনো মিরাকল ঘটিয়েও এগিয়ে যাইনি, আবার ধীরগতিতেও না। আমরা ছন্দময় একটা গতিতে এগিয়েছি। তো, ওই সময়ের বেস্ট ছিল ওই দল, এই সময়ের বেস্ট এই দল। তেমনি চার-পাঁচ বছর পরের দলও ওই সময়ের বেস্ট হবে।
আপনি নিজে কোন দলে খেলা বেশি উপভোগ করেছেন?
রাজ্জাক: আমার সঙ্গে সবার সম্পর্ক আসলে দারুণ। তবে ব্যাপারটা হলো, তখন আমি ছিলাম দলে তরুণ। খারাপ করলে সবাই এসে সান্ত্বনা দিত, ভালো করলে উৎসাহ। অনেক পরামর্শ দিত সবাই। ওই জিনিসটা এখন মিস করি, কারণ এখন আমিই সবচেয়ে সিনিয়র। আমাকেই বলতে হয় ওসব। এখনো যে টিমমেটটরা সাপোর্ট করে না, তা নয়। তবে সিনিয়র হিসেবে বলা আর জুনিয়র হিসেবে বলার মধ্যে একটা পার্থক্য তো থাকেই।
এই যে আটাশেই আপনি দলের সবচেয়ে সিনিয়র, এটা কেমন লাগে?
রাজ্জাক: এভাবে আমি কখনো ভাবি না। কারণ, আমাদের সংস্কৃতিই তো এমন। মাইক হাসির যেমন তিরিশ বছর বয়সে অভিষেক হয়েছে, ওই সময়ে আমাদের অনেকের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। তবে এখন ফিটনেসের মান অনেক বেড়েছে, এখন আশা করি আর তিরিশেই কারও শেষ হবে না।
‘মুরব্বি’, ‘বুড়ো’ এসব বলে কেউ মজা করে না?
রাজ্জাক: করে না আবার? ওসব মজা-টজা তো সব দলেই হয়।
কে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়?
রাজ্জাক: তামিম-সাকিব সবচেয়ে বেশি, মুশফিকও।
এই যে সাকিব মোটামুটি বোলার থেকে রাতারাতি বিশ্বসেরা বাঁহাতি স্পিনারদের একজন হয়ে গেল, অবাক লাগে না?
রাজ্জাক: একটা কথা আগে বলি, ওর সঙ্গে আমার বোঝাপড়া কিন্তু দারুণ। ও আগে বোলিং করলে আমাকে বলে, ‘রাজ ভাই, ব্যাটসম্যান এ রকম বা উইকেট এমন’, আমি আগে বোলিং করলেও বলি। মাঠে কথা হয়তো খুব বেশি হয় না, কিন্তু শরীরী ভাষায়ও দুজন দুজনকে বুঝি। আর ওর উত্থানে অবাক হইনি, কারণ খেলাটার প্রতি ওর নিবেদন অসাধারণ। মানসিকতা শক্ত। ও ভালো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মানিয়ে নিতে একটু সময় তো লাগেই। তা নেওয়ার পর থেকেই ভালো করতে শুরু করেছে।
দুর্দান্ত ওয়ানডে রেকর্ডের পাশে এমন অনুজ্জ্বল টেস্ট রেকর্ড, আক্ষেপ হয় না?
রাজ্জাক: দেখুন, এই আক্ষেপ জিনিসটা আমার একদমই নেই। আমি সব সময়ই ভাবি, যেটুকু পেয়েছি, এটাও যদি না পেতাম! হয়তো ভাবতে পারেন বলার জন্য বলা, কিন্তু আমি সত্যিই এমন। তার মানে এই না যে আমার ভালো করার ক্ষুধা নেই। তবে আমি বড় কোনো লক্ষ্য ঠিক করি না। টেস্ট রেকর্ডটা ভালো করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে এবং আমি সর্বোচ্চ চেষ্টাও করব। তারপরও যদি না পারি, তাহলে আমার করার কিছুই নেই। ওই দুঃখে আমার রাতের ঘুম হারাম হবে না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কঠিনতম ব্যাটসম্যান?
রাজ্জাক: গ্রায়েম স্মিথ, সনাৎ জয়াসুরিয়া ও শিবনারায়ণ চন্দরপল। তিনজনকেই আমি আউট করেছি, কিন্তু ওদের বিপক্ষে কখনোই স্বচ্ছন্দ বোধ করিনি।
জয়াসুরিয়ারা তো অনেক সময় এমন মারতে শুরু করে যে বল করার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন মানসিক অবস্থাটা কী হয়?
রাজ্জাক: মাথাটা পুরো উল্টোপাল্টা হয়ে যায়, অস্থির লাগে। একসঙ্গে অনেকগুলো ভাবনা চলে আসে মাথায়। সব গুবলেট পাকিয়ে যায়। তার পরও মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হয়।
ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সুখস্মৃতি?
রাজ্জাক: ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই ইনজামামের উইকেট। খুব মারছিল, পরে স্ট্যাম্পিং করার পর পাইলট ভাইকে বলেছিলাম, কী, আউট হয়েছে তো? লারা-শচীনের উইকেটও স্মরণীয়।
আর দুঃসহ স্মৃতি?
রাজ্জাক: অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ অ্যাকশনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়া, আর কদিন আগে হল্যান্ডের কাছে হার।
কোনো আদর্শ ছিল কখনো?
রাজ্জাক: বোলিংয়ে কেউ কখনো ছিল না। তবে একসময় ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যান হতে চাইতাম। পরে সাঈদ আনোয়ারকেও খুব ভালো লাগত।
এমনিতে আপনার যেমন সিরিয়াস একটা ভাবমূর্তি আছে, ড্রেসিংরুমের রাজ্জাকও কি আসলে এমনই?
রাজ্জাক: আমার মনে হয় না খুব বেশি পার্থক্য হবে। তবে সবচেয়ে ভালো বলতে পারে ড্রেসিংরুমে যারা আসার সঙ্গে থাকে, তারা। বাইরে যেভাবে থাকি, হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে আরেকটু বেশি ফ্রেন্ডলি, মজা-টজা করি। কিন্তু কখনোই এতে কেন্দ্রীয় চরিত্র আমি নই।
বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম মাতিয়ে রাখে কে? সব দলেই যেমন একজন-দুজন থাকে...
রাজ্জাক: মাশরাফি আছে। নাজমুলও, ওকে নিয়ে আমরা অনেক মজা করি, ও নিজেও উপভোগ করে। এমন সব কথা বলে, হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
দলে, দলের বাইরে প্রিয় বন্ধু?
রাজ্জাক: দলের বাইরে অনেক, এক-দুজনের নাম বলতে চাই না। দলেও আমরা সবাই খুব ঘনিষ্ঠ। তারপরও মাশরাফি, রাসেল ও আমার সম্পর্কটা একটু অন্য রকম।
অবসর কাটে কীভাবে?
রাজ্জাক: প্রচুর গান শুনি। নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ নেই, যেটা ভালো লাগে, সেটাই শুনি। লম্বা কোনো অবসর তো পাই না। তবে খানিকটা ছুটি-টুটি পেলে বাগেরহাট চলে যাই। ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, ক্যারম খেলি আমাদের ক্লাবে, ফুটবল খেলি। যখন ছুটি কাটাই তখন আমি ক্রিকেট নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, ভাবতেও চাই না।
আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন? খেলা নিয়ে বা খেলার বাইরে...
রাজ্জাক: খেলা নিয়ে তো স্বপ্ন নেই বলেছিই। খেলার বাইরে আমি সংগঠক হতে চাই, হয়তো সমাজসেবা করব। আমি আসলে ঠিক পরিষ্কার নই...তবে খুব ভালো একজন সংগঠক হতে চাই[/বাংলা]
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-12-15/news/115226
Probably the longest interview i ever read by PA.
জিম্বাবুয়ে সিরিজটা তো আপনার দুহাত ভরিয়ে দিল, অথচ এর আগের বছরটা খুব বাজে কেটেছে। ১৮ ম্যাচে উইকেট ছিল মাত্র ১৬টি...
আবদুর রাজ্জাক: আসলে আমি ওসব নিয়ে বেশি ভাবিনি। খেলোয়াড়দের জীবনে এটা খুবই স্বাভাবিক—ভালো সময় যেমন আসে, খারাপ সময়ও আসে। তা ছাড়া আমি এসব হিসাবও করি না। বিশ্বাস করুন, ১৮ ম্যাচে ১৬ উইকেট না হয়ে যদি ৪০ উইকেট হতো, তাহলেও আমার হিসাব থাকত না। এই যে এই সিরিজে এত রেকর্ড করলাম, আপনারা না বললে আমি জানতামও না। আমি শুধু দলের জন্য অবদান রাখতে চাই।
এ কাজটাই তো ঠিকমতো করতে পারছিলেন না, এতে তো খারাপ লাগার কথা?
রাজ্জাক: হ্যাঁ, মনে হয়েছে আমি ঠিকমতো পারছি না। কিন্তু এটাও ভেবেছি, এখন পারছি না মানে সামনে যে পারব না তা তো নয়। আমার মনে হয় ক্রিকেটে জটিল চিন্তা করা মানে নিজেকে বিপদে ফেলা। নিজের ওপর প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিলে খুব কমই সফল হওয়া যায়। আমি তাই সবকিছু খুব সহজভাবে দেখি। আর যে ১৮ ম্যাচের কথা বললেন, ওই সময়টা আমি আসলে একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে, তবে বিশ্বাস ছিল সুসময় ফিরে আসবেই।
এ প্রসঙ্গেই আসতাম। এই সিরিজের বোলিং দেখে মনে হলো, বোলিং অ্যাকশন শোধরানোর পর আপনার বোলিংয়ে আরও বৈচিত্র্য যোগ হয়েছে। ফ্লাইট-লুপ এসব আগে এত ভালো ছিল না, এত টার্নও পেতেন না...
রাজ্জাক: হ্যাঁ, এটাই বলছিলাম যে মানিয়ে নিতে একটু সময় লেগেছে। তার মানে এই না যে এখন যেমন উইকেট পাচ্ছি, এভাবে পেতেই থাকব। খারাপ সময় আবারও আসতে পারে। লোকজন ভালো সময় ভালো বলবে, খারাপ সময়ে খারাপ। আমাদের ওসব নিয়ে ভাবলে চলে না, নিজেদের কাজটা করে যেতে হয়।
অনেকবার বলেছেন, তবুও আপনার সঙ্গে কথা বললে বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটির ব্যাপারটা তো আসবেই। কেমন লেগেছে তখন?
রাজ্জাক: এই কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না। তবে দুবারের অনুভূতিতে একটু পার্থক্য ছিল। প্রথমবার খুব অবাক হয়েছিলাম। তখন ১৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হাত বাঁকানোর নিয়ম ছিল না। ঘরোয়া লিগে দু-একজন আম্পায়ার কখনো কখনো বলেছেন, আমার নিজের কিন্তু কখনো সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি। তবে নিশ্চয়ই ঝামেলা ছিল, না হলে তো আর অভিযুক্ত হতাম না! ১৫ ডিগ্রির নিয়ম করার পর আমার জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল। কারণ আমার ৯-১০ ডিগ্রির বেশি বাঁকত না। কঠিন সময় গেছে আসলে দ্বিতীয়বার। গড়ে ১৬ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকত, কখনো কখনো ২৩-২৪-২৮ ডিগ্রি! নিজেরই সন্দেহ হচ্ছিল, এবার ফিরতে পারব তো? পরে জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম, আমি এটা শুধরে আবার জাতীয় দলে একটা ম্যাচ হলেও খেলব। তারপর বাদ পড়ে গেলে যাব, কোনো দুঃখ থাকবে না।
এসব সময়ে মানসিক সমর্থনটাও তো বড় ব্যাপার। সেটি কার কাছ থেকে বেশি পেয়েছেন?
রাজ্জাক: নিঃসন্দেহে সালাউদ্দিন ভাই (জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ)। বিশ্বাস করবেন না, সারা দিন আমার সঙ্গে লেগে থাকতেন। এমনকি সন্ধ্যার পরও ফোনে এটা-ওটা পরামর্শ দিয়ে যেতেন। ওই সময় আমার কিছুই ভালো লাগত না। ওই চারটা মাস যে কীভাবে গেছে, কাউকে বোঝাতে পারব না। ক্রিকেট না খেলে ঘরে বসে থাকব, এটা আমি চিন্তাই করতে পারছিলাম না। ওই সময় সালাউদ্দিন ভাই যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন, তাঁর মতো একজন অসাধারণ মানুষের পক্ষেই কেবল তা সম্ভব।
ওই সময়ে বা অন্য কোনো সময় মনে হয়েছে, একজন স্পিন কোচ থাকলে ভালো হতো?
রাজ্জাক: দেখুন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সালাউদ্দিন ভাই অনেক জানেন। উনি যেসব জানেন বা করতে বলেন, আমরা আসলে ওটাই এখনো ঠিকমতো করতে পারিনি। আগে তো উনারগুলো শিখি, তারপর না-হয় এর চেয়ে বেশি জানা কারও কাছ থেকে শিখব। স্পিন কোচের কথা কখনো তাই মনে হয়নি। তা ছাড়া উনাকে যখন, যেভাবে ডাকি, পাশে পেয়ে যাই। উনার সঙ্গে বোঝাপড়াটা এমন যে একটু কিছু বললেই পুরোটা বুঝে ফেলি। আসলে বিকেএসপিতে অনেক ছোট থেকেই তাঁর সঙ্গে আছি বলেই হয়তো এই বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। আমাকে উনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
বিকেএসপির প্রসঙ্গে আসার আগে আরেকটু আগে ফিরে যাই, ক্রিকেটে হাতেখড়ি হলো কীভাবে?
রাজ্জাক: শুরু করেছি ক্লাস ফোর-ফাইভে, টেনিস বলে। তখন ব্যাটসম্যান ছিলাম। ওই বয়সেই আমাদের পাড়ার ক্লাবে খেলেছি, মনে হয় ভালোই খেলতাম! আমার জন্য আলাদা থাকত একটা ছোট ব্যাট। এভাবে খেলতে খেলতেই একদিন বিকেএসপিতে গেলাম।
বিকেএসপিতে যাওয়ার কাহিনিটা একটু শোনা যাক...
রাজ্জাক: তসলিম চাচা নামে আমার এক চাচা ছিলেন, উনিই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমাকে ভর্তি করান। সেই সময় নিভৃত গ্রামে বিজ্ঞাপন দেখে ফরম পূরণ করে পাঠানো চাট্টিখানি কথা নয়, তসলিম চাচার কাছে আমি অনেক ঋণী। ফরম পূরণ করার সময় মজার একটা ঘটনা হয়েছিল। পাসপোর্ট সাইজ ছবি দিতে হবে, স্টুডিওতে গিয়ে দেখি কারেন্ট নেই। ছবি তোলার মতো আলো নেই। কিন্তু ফরম ওই দিনই পাঠাতে হবে। পরে বাইরে এসে চাচা একটা কালো কাপড় আমার পেছনে ধরল, আমি চেয়ারে বসলাম, ছবি তোলা হলো। পরে পরীক্ষা দিয়ে চান্সও পেয়ে গেলাম।
বিকেএসপিতে কি ব্যাটসম্যান হিসেবেই ঢুকেছিলেন?
রাজ্জাক: ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পেস বোলিংও করতাম। তখন কোচ ছিলেন ইমরান স্যার-ফাহিম স্যার। ইমরান স্যার চাইতেন ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পেস বোলিং করি। ফাহিম স্যার চাইতেন ব্যাটসম্যান কাম স্পিনার হই। তখন ঘাসে খেলা হলে সবাই স্পিন বোলিং করতাম। ঘাসের খেলায় প্রথম স্পিন বল করে ৫ ওভারে ৪ রান দিয়ে ৫ উইকেট পেয়েছিলাম। তারপর থেকে ফাহিম স্যার বলতেন, তুমি স্পিনই করো। আমি এটা শুনলেই ভয় পেতাম, ‘স্যার কী বলে, জীবনে কখনো স্পিন করিইনি, স্পিনার হব কীভাবে!’
তো স্পিনার হলেন কীভাবে?
রাজ্জাক: আস্তে আস্তে হয়ে গেছি। বিকেএসপিতেই একবার ইনজুরড হওয়ায় পেস বোলিং করতে পারছিলাম না। তার পরও দলে ছিলাম, কারণ ওপেনিং-ওয়ান ডাউনে ব্যাট করতাম। কিন্তু দলে বেশি বোলার নেই; অধিনায়ক বলল, তুই স্পিনই কর। এই শুরু। ক্লাস নাইনে থাকতে থার্ড ডিভিশন কোয়ালিফাইং খেলেছিলাম সিসিএসের হয়ে। প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরিও করেছিলাম। ১৯৯৯ সালে প্রথম বিভাগ আজাদ স্পোর্টিংয়ে। তখনো আমি ওপেনিং ব্যাটসম্যান আর পেস বোলার। বিকেএসপি থেকে বের হয়ে ২০০২-০৩ জাতীয় লিগ খেলি খুলনার হয়ে, চার মাচে একটা ফিফটি আর একটা ৪৫ ছিল। ভালোভাবে স্পিন শুরু করলাম বিমানে এসে, পুরোপুরি স্পিনার হলাম পরের বছর ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে। বিমানে গিয়ে চোট পেয়েছিলাম। অধিনায়ক ফারুক ভাই বলল, ‘আপাতত ম্যাচ খেলার দরকার নেই। তুই বিশ্রাম নে আর নেটে স্পিন কর।’ তখন স্পিনে জোর দিলাম। পরের বছর ভিক্টোরিয়ায় গিয়ে ব্যাটিংই পেতাম না, এ জন্য বোলিংয়েই মন দিলাম। তবে এখনো আমি মনে করি না ্ব্যাট হাতে ভালো কিছু করার সময় শেষ হয়ে গেছে।
প্রথম জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর অনভূতিটা কেমন ছিল?
রাজ্জাক: জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বগুড়ায় ‘এ’ দলের সিরিজ দেখতে গিয়েছিল ডেভ (হোয়াটমোর)। প্রথম ম্যাচ দেখেই নাকি ম্যানেজার-নির্বাচকদের বলে রেখেছিল আমাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের দলে নিতে চায়। ওই দিন খেলা শেষে রোকন ভাই (আল-শাহরিয়ার), রাজীব (শাহাদাত হোসেন), অলকরা (কাপালি) বলছিল, তুই তো চান্স পেয়ে গেছিস। আমি ভাবলাম, স্রেফ ফাজলামো। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকায় ৭ উইকেট পেলাম, পরের ম্যাচে ৪ উইকেট, মনে হচ্ছিল ডাক পেতে পারি। একদিন কোনো এক বোর্ড কর্মকর্তার ফোন পেলাম। বলল তোমাকে দলে নেওয়া হয়েছে, ঠিকমতো অনুশীলন করো। এটুকু বলেই রেখে দিল, নাম-ধাম কিছু বলল না। তখনো তাই বিশ্বাস হয়নি। পরদিন পত্রিকায় নাম দেখে কেমন যে লেগেছিল, সেটা বলে বোঝাতে পারব না।
এরপর থেকে আপনার অভিযান তো আমরা মোটামুটি জানিই। একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। হাবিবুল-রফিকদের দলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন আপনি, এই দলেরও। দুটো দলের তুলনা কীভাবে করবেন?
রাজ্জাক: সত্যি বলতে তখন একটু রিল্যাক্সড ক্রিকেট হতো, এখন আর সেই সুযোগ নেই। এখন যেমন একটা সিরিজ হলেই আমাদের মূল লক্ষ্য থাকে জয়, বিশেষ করে দেশের মাটিতে। তখন এতটা চাপ ছিল না। একটা-দুটো জয় পেতাম অনেক দিন পরপর। এখনো যে টানা জিতেই যাচ্ছি, তা নয়। তবে প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক, ধাপে ধাপে আমাদের উন্নতি হয়েছে। আমার কাছে এই ধাপে ধাপে উন্নতির ব্যাপারটা খুবই ভালো লাগে। আমরা কোনো মিরাকল ঘটিয়েও এগিয়ে যাইনি, আবার ধীরগতিতেও না। আমরা ছন্দময় একটা গতিতে এগিয়েছি। তো, ওই সময়ের বেস্ট ছিল ওই দল, এই সময়ের বেস্ট এই দল। তেমনি চার-পাঁচ বছর পরের দলও ওই সময়ের বেস্ট হবে।
আপনি নিজে কোন দলে খেলা বেশি উপভোগ করেছেন?
রাজ্জাক: আমার সঙ্গে সবার সম্পর্ক আসলে দারুণ। তবে ব্যাপারটা হলো, তখন আমি ছিলাম দলে তরুণ। খারাপ করলে সবাই এসে সান্ত্বনা দিত, ভালো করলে উৎসাহ। অনেক পরামর্শ দিত সবাই। ওই জিনিসটা এখন মিস করি, কারণ এখন আমিই সবচেয়ে সিনিয়র। আমাকেই বলতে হয় ওসব। এখনো যে টিমমেটটরা সাপোর্ট করে না, তা নয়। তবে সিনিয়র হিসেবে বলা আর জুনিয়র হিসেবে বলার মধ্যে একটা পার্থক্য তো থাকেই।
এই যে আটাশেই আপনি দলের সবচেয়ে সিনিয়র, এটা কেমন লাগে?
রাজ্জাক: এভাবে আমি কখনো ভাবি না। কারণ, আমাদের সংস্কৃতিই তো এমন। মাইক হাসির যেমন তিরিশ বছর বয়সে অভিষেক হয়েছে, ওই সময়ে আমাদের অনেকের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। তবে এখন ফিটনেসের মান অনেক বেড়েছে, এখন আশা করি আর তিরিশেই কারও শেষ হবে না।
‘মুরব্বি’, ‘বুড়ো’ এসব বলে কেউ মজা করে না?
রাজ্জাক: করে না আবার? ওসব মজা-টজা তো সব দলেই হয়।
কে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়?
রাজ্জাক: তামিম-সাকিব সবচেয়ে বেশি, মুশফিকও।
এই যে সাকিব মোটামুটি বোলার থেকে রাতারাতি বিশ্বসেরা বাঁহাতি স্পিনারদের একজন হয়ে গেল, অবাক লাগে না?
রাজ্জাক: একটা কথা আগে বলি, ওর সঙ্গে আমার বোঝাপড়া কিন্তু দারুণ। ও আগে বোলিং করলে আমাকে বলে, ‘রাজ ভাই, ব্যাটসম্যান এ রকম বা উইকেট এমন’, আমি আগে বোলিং করলেও বলি। মাঠে কথা হয়তো খুব বেশি হয় না, কিন্তু শরীরী ভাষায়ও দুজন দুজনকে বুঝি। আর ওর উত্থানে অবাক হইনি, কারণ খেলাটার প্রতি ওর নিবেদন অসাধারণ। মানসিকতা শক্ত। ও ভালো আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মানিয়ে নিতে একটু সময় তো লাগেই। তা নেওয়ার পর থেকেই ভালো করতে শুরু করেছে।
দুর্দান্ত ওয়ানডে রেকর্ডের পাশে এমন অনুজ্জ্বল টেস্ট রেকর্ড, আক্ষেপ হয় না?
রাজ্জাক: দেখুন, এই আক্ষেপ জিনিসটা আমার একদমই নেই। আমি সব সময়ই ভাবি, যেটুকু পেয়েছি, এটাও যদি না পেতাম! হয়তো ভাবতে পারেন বলার জন্য বলা, কিন্তু আমি সত্যিই এমন। তার মানে এই না যে আমার ভালো করার ক্ষুধা নেই। তবে আমি বড় কোনো লক্ষ্য ঠিক করি না। টেস্ট রেকর্ডটা ভালো করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে এবং আমি সর্বোচ্চ চেষ্টাও করব। তারপরও যদি না পারি, তাহলে আমার করার কিছুই নেই। ওই দুঃখে আমার রাতের ঘুম হারাম হবে না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কঠিনতম ব্যাটসম্যান?
রাজ্জাক: গ্রায়েম স্মিথ, সনাৎ জয়াসুরিয়া ও শিবনারায়ণ চন্দরপল। তিনজনকেই আমি আউট করেছি, কিন্তু ওদের বিপক্ষে কখনোই স্বচ্ছন্দ বোধ করিনি।
জয়াসুরিয়ারা তো অনেক সময় এমন মারতে শুরু করে যে বল করার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন মানসিক অবস্থাটা কী হয়?
রাজ্জাক: মাথাটা পুরো উল্টোপাল্টা হয়ে যায়, অস্থির লাগে। একসঙ্গে অনেকগুলো ভাবনা চলে আসে মাথায়। সব গুবলেট পাকিয়ে যায়। তার পরও মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হয়।
ক্রিকেটে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে সুখস্মৃতি?
রাজ্জাক: ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই ইনজামামের উইকেট। খুব মারছিল, পরে স্ট্যাম্পিং করার পর পাইলট ভাইকে বলেছিলাম, কী, আউট হয়েছে তো? লারা-শচীনের উইকেটও স্মরণীয়।
আর দুঃসহ স্মৃতি?
রাজ্জাক: অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ অ্যাকশনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়া, আর কদিন আগে হল্যান্ডের কাছে হার।
কোনো আদর্শ ছিল কখনো?
রাজ্জাক: বোলিংয়ে কেউ কখনো ছিল না। তবে একসময় ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যান হতে চাইতাম। পরে সাঈদ আনোয়ারকেও খুব ভালো লাগত।
এমনিতে আপনার যেমন সিরিয়াস একটা ভাবমূর্তি আছে, ড্রেসিংরুমের রাজ্জাকও কি আসলে এমনই?
রাজ্জাক: আমার মনে হয় না খুব বেশি পার্থক্য হবে। তবে সবচেয়ে ভালো বলতে পারে ড্রেসিংরুমে যারা আসার সঙ্গে থাকে, তারা। বাইরে যেভাবে থাকি, হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে আরেকটু বেশি ফ্রেন্ডলি, মজা-টজা করি। কিন্তু কখনোই এতে কেন্দ্রীয় চরিত্র আমি নই।
বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম মাতিয়ে রাখে কে? সব দলেই যেমন একজন-দুজন থাকে...
রাজ্জাক: মাশরাফি আছে। নাজমুলও, ওকে নিয়ে আমরা অনেক মজা করি, ও নিজেও উপভোগ করে। এমন সব কথা বলে, হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
দলে, দলের বাইরে প্রিয় বন্ধু?
রাজ্জাক: দলের বাইরে অনেক, এক-দুজনের নাম বলতে চাই না। দলেও আমরা সবাই খুব ঘনিষ্ঠ। তারপরও মাশরাফি, রাসেল ও আমার সম্পর্কটা একটু অন্য রকম।
অবসর কাটে কীভাবে?
রাজ্জাক: প্রচুর গান শুনি। নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ নেই, যেটা ভালো লাগে, সেটাই শুনি। লম্বা কোনো অবসর তো পাই না। তবে খানিকটা ছুটি-টুটি পেলে বাগেরহাট চলে যাই। ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিই, ক্যারম খেলি আমাদের ক্লাবে, ফুটবল খেলি। যখন ছুটি কাটাই তখন আমি ক্রিকেট নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, ভাবতেও চাই না।
আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন? খেলা নিয়ে বা খেলার বাইরে...
রাজ্জাক: খেলা নিয়ে তো স্বপ্ন নেই বলেছিই। খেলার বাইরে আমি সংগঠক হতে চাই, হয়তো সমাজসেবা করব। আমি আসলে ঠিক পরিষ্কার নই...তবে খুব ভালো একজন সংগঠক হতে চাই[/বাংলা]
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-12-15/news/115226
Probably the longest interview i ever read by PA.