View Single Post
  #53  
Old November 4, 2011, 03:06 PM
idrinkh2O's Avatar
idrinkh2O idrinkh2O is offline
Test Cricketer
 
Join Date: April 9, 2011
Favorite Player: Performing Tigers
Posts: 1,869

তেতো করলায় জীবনের জয়গান
রহিদুল মিয়া, আলতাফ হোসেন, মিঠাপুকুর (রংপুর) থেকে | তারিখ: ০৮-১০-২০১১


রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামে নিজের খেতে করলা তুলছেন শাহজাহান আলী

শাহজাহান আলীর বসতভিটা ছাড়া কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমিতে কামলা খেটে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। এক বেলা খাবার জুটলেও আরেক বেলা জুটত না। ৩০ বছর আগে শাহজাহানের অবস্থা ছিল এ রকম। আর আজ?

আজ তিনি একজন সফল চাষি। করলা চাষে তাঁর সাফল্যের পথ ধরে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। শাহজাহান আলী (৬০) আজ শত শত কৃষকের পথপ্রদর্শকও। তাঁর গ্রাম থেকে শুরু হয়ে করলার চাষ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের দশ গ্রামে। মিঠাপুকুরের করলার সুনাম দূরদূরান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে।

করলাপল্লিতে একদিন: মিঠাপুকুর উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার উত্তরে রানীপুকুর ইউনিয়নে নয়াপাড়া গ্রাম। এ গ্রামে শাহজাহানের বাড়ি। কাঁচা-পাকা পথ ধরে তাঁর বাড়িতে যাওয়ার পথে ওই গ্রামে ঢুকেই অভাবিত দৃশ্য চোখে পড়ে। গ্রামের মাঠজুড়ে অসংখ্য করলাখেতের মাচা। গ্রামের নারী-পুরুষ কেউ খেত থেকে করলা তুলছেন, কেউ করছেন খেতের পরিচর্যা। প্রতিটি বাড়িতেই স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি।

বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করতেই একজন দেখিয়ে দেন, ওই যে শাহাজাহান করলাখেতে কাজ করছেন। এই প্রতিবেদককে দেখে জমি থেকে আলে উঠে আসেন। শোনান করলার চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার গল্প।

কষ্টের অতীত: ১৯৫০ সালে দরিদ্র পরিবারে জন্ম শাহজাহানের। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। বাবার অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। দিনমজুরির কাজ পেলে খাবার জুটত, না পেলে অনাহার।

১৯৮০ সালের কথা, কাজ না পাওয়ায় শাহজাহান দুই দিনেও চাল জোটাতে পারেনি। তাই বাড়ির পাশে রাস্তার ধারে বসে মনের দুঃখে কাঁদছিলেন। ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন একই গ্রামের সবজিবীজের বিক্রেতা হায়দার আলী। শাহজাহানের কষ্টের কথা শুনে তাঁর হাতে তিনি ১০০ টাকা আর ২০০ গ্রাম করলার বীজ তুলে দেন।

হায়দারের পরামর্শে এ বীজ শাহজাহান লাগান ৪ শতক বসতভিটার চারদিকে। ৬০ দিনের মাথায় খেতে করলা ধরে। ফলন দেখে শাহাজাহানের মুখে হাসি ফুটে। এ করলা বিক্রি করে আয়ও আসে ৮০০ টাকা। এরপর পুরোপুরি করলা চাষে লেগে পড়েন। প্রথম বছরের ৮০০ টাকা দিয়ে পরের বছর অন্যের ১৫ শতক জমি বর্গা নেন। এবারও তাঁর করলার ফলন ভালো হয়। বসতভিটাসহ ১৫ শতক জমির করলা বিক্রি করে আয় করেন ছয় হাজার টাকা।

এভাবে একপর্যায়ে চাষের জমি বাড়ে, আয় বাড়ে। করলা চাষের টাকায় কেনেন তিন একর জমি, বানান পাকা বাড়ি। মাছ চাষের জন্য খনন করেন পুকুর, সাতটি গরুর একটি খামারও করেছেন। দুই মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দেন। তিন ছেলে রবিউল, রেজাউল ও শফিকুল লেগে আছেন করলা চাষে। এবারে দুই একরে করেছেন করলার চাষ। ইতিমধ্যে এক লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছেন। এখনো খেতে যে পরিমাণ করলা আছে, তা বিক্রি করলে আয় হবে দেড় লাখ টাকা।

করলা ফুটাল হাসি: ১০ বছর আগে নয়াপাড়া গ্রামের নজরুল ইসলামকে সবাই দিনমজুর হিসেবে চিনত। আশ্বিন-কার্তিক মাসে তাঁর পরিবারকে প্রায় উপোস থাকতে হতো। কিন্তু এখন নজরুলের ঘরে সারা বছর চাল থাকে। কামলাও খাটতে হয় না। অন্যের ২৮ শতক জমি বর্গা নিয়ে করলা চাষ শুরু করে তিনি টিনের বাড়ি করেছেন। নিজের কেনা দুই একর জমিতে এবার করেছেন করলার চাষ। এ পর্যন্ত এক লাখ ১০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছেন তিনি।

বলদী পুকুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করলা চাষ তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে। আগে এক বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে দায় হয়ে যেত, সেখানে এখন খাওয়া-পরা বাদেও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিতে পারছেন তিনি।

বসতভিটাসহ ১০ শতক জমিতে চাষ শুরু করেন দুর্গাপুর গ্রামের দিনমজুর আবু বকর। এখন তার বাড়ির চারদিকে গাছ-গাছালি ও দেড় একর জমিতে করলা রয়েছে। দুই হাজার টাকা ধার করে আট বছর আগে করলার চাষ শুরু করেন তিনি। এখন করলা বিক্রি করে বছরে আয় করেন দুই লাখ টাকা।

লাভ দ্বিগুণ: রসুলপুর গ্রামের কৃষক কেচু মিয়া বলেন, ধানের চেয়ে করলা চাষে লাভ দ্বিগুণ। এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ব্যয় হয় ১০-১১ হাজার টাকা। উৎপাদিত ধান বিক্রি হয় ১৮-১৯ হাজার টাকা। এতে লাভ হয় আট-নয় হাজার টাকা। কিন্তু এক বিঘায় করলা চাষ করতে ব্যয় হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার টাকা। উৎপাদিত করলা বিক্রি হয় ৬৫-৭০ হাজার টাকা। এতে বিঘায় করলা চাষ করে আয় আসে ৫০-৫৫ হাজার টাকা। প্রায় সারা বছরই করলা চাষ করা যায়। লাগানোর ৬০ দিনের মধ্যে করলা পাওয়া যায়। ভাদ্র-কার্তিক মাসে করলার ফলন ভালো হয়। হাইব্রিড, নেপালি, রানীপুকুর, সোনামুখী, বউ সোহাগীসহ নানা জাতের করলার চাষ হয় মিঠাপুকুরে।

গড়ে উঠেছে বাজার: করলা চাষ ঘিরে গড়ে উঠেছে চারটি বাজার। রানীপুকুর, বলদী পুকুর, জায়গীরহাট, শঠিবাড়ির হাটে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত করলা ছাড়াও নানা রকম সবজি বিক্রি হয়। এখান থেকে কেনা করলা ট্রাকে করে ঢাকার সাভার, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন আড়তে যায়। অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী সরাসরি খেত থেকেও করলা কিনে থাকেন। স্থানীয় বাজারে বর্তমান প্রতি মণ করলা প্রকারভেদে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তাঁরা যা বললেন: রানীপুকুর ইউনিয়ন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বুলবুল মিয়া বলেন, শাহাজাহান সব কৃষকের মডেল। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার কৃষকেরা করলা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, তিনি জেনেছেন শাহজাহান আলী এই অঞ্চলে করলা চাষের সূচনা করেছেন। তার আগে কেউ এভাবে করলা চাষ করেনি। তিনি বলেন, করলার চাষে খরচ কম, লাভ বেশি হওয়ায় শত শত কৃষক করলা চাষ করছেন। মিঠাপুকুরে এবারে এক হাজার ২২০ একর জমিতে করলার চাষ হয়েছে। চাষিদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এবং শাহজাহান: কষ্টে ধরে আসা গলায় শাহাজাহান আলী বলেন, ‘ঈদেও স্ত্রী-সন্তানদের কাপড় দিতে পারতাম না। কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। করলা চাষ করে এত দূর এসেছি, করলা চাষ নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চাই।’

শাহজাহানের স্ত্রী রশিদা বেগম বলেন, ‘লোকটা সারা দিন করলাখেতে কাজ করে। আমি একটু দেখতে আসি। মাঝেমধ্যে নিজেও একটু হাত লাগাই।’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের যথেষ্ট সুখে রেখেছে, এভাবেই মরতে চাই।’
__________________
-- Alwayz with !!! Champions are made from something they have deep inside them - a desire, a dream, and a vision!
-- Bangladesh are the Runners-up in the 2012 ASIA Cup!
Reply With Quote