View Single Post
  #2  
Old December 2, 2011, 04:23 AM
PoorFan PoorFan is offline
Moderator
 
Join Date: June 15, 2004
Location: Tokyo
Posts: 14,335


বিজয়ের ৪০ বছর: বিদেশি সহযোদ্ধা

যুদ্ধবিবেক আর্চার ব্লাড

মিজানুর রহমান খান | তারিখ: ০২-১২-২০১১


  • ৪ মন্তব্য
  • প্রিন্ট
  • ShareThis




« আগের সংবাদ পরের সংবাদ»
  • আর্চার ব্লাড
1 2




তাঁকে বাংলাদেশের যুদ্ধবিবেক বলা যায়। তিনি একাত্তরে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কেন্ট ব্লাড। তিনি নিক্সন-কিসিঞ্জারের পাকিস্তানপন্থী অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে একাত্তরে আমেরিকার বিবেক হয়ে উঠেছিলেন।
১৯৬০ সালে ব্লাড ঢাকায় ছিলেন মার্কিন পলিটিক্যাল কর্মকর্তা হিসেবে। তখন বাংলার রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই থেকে আজ অবধি ব্লাড পরিবার বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয়। ব্লাড চিরনিদ্রায় শায়িত কলোরাডোর ফোর্ট কলিন্সে। তাঁর স্ত্রী মেগ ব্লাড, ছেলে পিটার ব্লাড—বস্তুত, পুরো ব্লাড পরিবারের মনন ও চিন্তায় বাংলাদেশ চিরভাস্মর।
গত বছরের মার্চে পিটার ব্লাডের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ ঘটে। তিনি বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ তথ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। ওই সময় তাঁর মা মেগ ব্লাডের আবেগাপ্লুত চিঠি পেয়েছিলাম, ‘ব্লাড দেখেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যোদয়।’ প্রথম আলোয় তা ছাপা হয়।
‘সৃজনশীল ভিন্নমতাবলম্বী’ হিসেবে পরবর্তী সময়ে পুরস্কৃত আর্চার ব্লাড নামটি মার্কিন কূটনৈতিক জগতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে। তবে এই জগ ৎ টি অবশ্যই নিক্সন-কিসিঞ্জারের সরকারি তকমা আঁটা ওয়াশিংটনের জগ ৎ নয়।
৬ এপ্রিল ১৯৭১ ঐতিহাসিক ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ঢাকায় মার্কিন কর্মকর্তারা পঁচিশের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া-ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা খুব ভেবেচিন্তে একটি কেব্ল লিখেছিলেন। এতে সই করেছিলেন ব্লাড ও তাঁর ২০ জন সমর্থক সহকর্মী। তাঁরা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন।
ব্লাড তাতে শুধুই সই দেননি, বাড়তি এক ব্যক্তিগত নোটও লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’ এই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ বস্তুত তখনকার নিক্সন-কিসিঞ্জারের দুর্গে বোমা ফেলেছিল।
‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’-এর লেখক ক্রিস্টোফার হিচিনসের কথায়, ‘মার্কিন ইতিহাসে ব্লাড টেলিগ্রামের কোনো তুলনা নেই।’ কিসিঞ্জার এ জন্য ব্লাডকে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিলেন।
ওই ‘ব্লাড টেলিগ্রামে’ সইদাতা ২০ কূটনীতিকের সন্ধান ও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগে প্রথম আলোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পিটার ব্লাড জানান, ক্রেইগ ব্যাক্সস্টার (পরবর্তীকালের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ) বেঁচে নেই। ডব্লিউ স্কট বুচার মার্কিন সমারিক বাহিনীর প্রশিক্ষক। হাওয়ার্ড শেফার্ড (পরে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত) রয়েছেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। হার্ব গর্ডন (একাত্তরে কলকাতায় কনসাল জেনারেল) থাকেন মেরিল্যান্ডে।
বিজয় মাসের প্রথম প্রহরে পিটার ব্লাডের সঙ্গে ই-মেইল বিনিময় হলো। পিটার বৃহস্পতিবার প্রতিবেদককে লিখেছেন, বাংলাদেশের বিজয়ের ৪০তম বার্ষিকীতে তিনি ও তাঁর মা মেগ মিলওয়ার্ড ব্লাড ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক সাময়িকীর জন্য নিবন্ধ লিখেছেন। আর্চার ব্লাড তাঁর দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়ের সূচনায় লেখেন, ‘একাত্তর নিয়ে লিখতে বসে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। কারণ আমার বহু বন্ধুর মুখ ভেসে উঠছে, যারা শহীদ হয়েছে।’
আর্চার ব্লাড ২৫ বছরের ব্যবধানে বিজয়ের রজতজয়ন্তীতে ১৯৯৬ সালে ঢাকায় ফিরেছিলেন। তাঁর বন্ধু এ এম এ মুহিতের বাসভবনে মতিউর রহমানের উপস্থিতিতে কথা হয়। সেই আলোচনার ফসল ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর ওই স্মৃতিচারণমূলক বই।
আর্চার কে ব্লাড রূপসী বাংলার প্রেমে মোহাবিষ্ট হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পল্লি কবি জসীমউদ্দীন ব্লাড পরিবারের প্রিয়। আর্চার ব্লাডের বয়ানে, ‘যত দূর চোখ যায় পানি আর পানি, আদিগন্ত সবুজ ধানক্ষেত, কচুরিপানার বেগুনি রং আর তাতে ঠিকরে পড়া সোনালি সূর্যের ঝিকিমিকি—এই হলো বাংলার যাদু।’
পিটারের স্মৃতিচারণ, ‘আমার বাবা ভার্জিনিয়ার জেফারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক হিসেবে গর্বিত ছিলেন। দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সপক্ষে অবস্থান নিতে জেফারসনীয় (মার্কিন সংবিধানের মুখ্য জনক) মন্ত্রে তিনি আস্থাবান ছিলেন।’
স্বাধীনতার পরে নিক্সন-কিসিঞ্জার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও ঠেকিয়েছিলেন। ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারে বঙ্গবন্ধুর সরকার যাতে ব্যর্থ হয়, সে জন্য মাও সেতুংয়ের সমর্থন পেয়েছিলেন কিসিঞ্জার। বেইজিংয়ে মাওকে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের বিচারের উদ্যোগ ভণ্ডুল করে দেওয়াই হবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি।’
যুক্তরাষ্ট্র এসবের জন্য আজও ক্ষমা চায়নি। বরং গুয়ানতানামো বের কালিমা নিয়ে তাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন আমাদের ট্রাইব্যুনালের ‘স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা’ নিয়ে ভীষণ বিচলিত। তবে এটাই যুক্তরাষ্ট্রের পুরো চেহারা নয়।
আর্চার ব্লাডকে সহযোদ্ধা নয়, বাংলাদেশের একমাত্র আমেরিকান ‘সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা’ বলতে পারলেই স্বস্তি পেতাম। কারণ মার্কিন কূটনীতিক হয়েও তিনি তাঁর ধানমন্ডির বাসার পেছনের বাগানে একদল বাঙালি পুলিশের অস্ত্র মাটি খুঁড়ে কয়েক দিন লুকিয়ে রেখেছিলেন।
আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই শ্রেষ্ঠ বীর আর্চার কেন্ট ব্লাডের স্মৃতির প্রতি। ১ ডিসেম্বর ভোর পাঁচটায় আমি তাঁর ছেলে পিটার ব্লাডকে লিখলাম, ‘জেফারসনীয় মূল্যবোধের প্রকৃত উত্তরাধিকার ব্লাড পরিবার।’ পিটারের শেষ উক্তি: ‘আপনাকে সবিনয়ে ধন্যবাদ জানাই।’


Prothom Alo
Reply With Quote