View Single Post
  #1  
Old January 9, 2013, 02:00 AM
WarWolf WarWolf is offline
Cricket Guru
 
Join Date: March 3, 2007
Favorite Player: Love them all....
Posts: 11,437
Default জামদানি শিল্পের স্বত্ব

জামদানি বাংলাদেশের সংস্কৃতির গভীর হইতে সৃষ্ট ঐতিহ্যবাহী একান্ত সম্পদ হইলেও আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচে সম্প্রতি ইহার মেধাস্বত্ব ভারতের দখলে চলিয়া যাইতে বসিয়াছে। জামদানি কেবল আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই নয়, ইহার সুদীর্ঘ ইতিহাসও রহিয়াছে। যুগে যুগে জামদানি বাংলার স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্যের দূত হইয়াছে এবং প্রাচীন বিভিন্ন দলিলপত্রেও ইহার সপ্রশংস উল্লেখ রহিয়াছে। তিন হাজার বত্সরের পুরাতন গ্রন্থ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে জামদানিকে বাংলা ও পূর্ব অঞ্চলের এক সূক্ষ্ম তাঁতবস্ত্র হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। পর্যটক ইবনে বতুতাও বাংলাদেশের সোনারগাঁ অঞ্চলে জামদানি দেখিয়াছেন এবং প্রশংসা করিয়াছেন। মুঘল আমলে প্রথম জামদানি তত্কালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে ছড়াইয়া পড়ে। পরবর্তীকালে ইউরোপ, পারস্য, আর্মেনিয়াতেও জামদানি বাণিজ্য সমপ্রসারিত হইয়াছে এবং ইংল্যান্ড যন্ত্রচালিত জামদানি তৈয়ার করিয়াছে। কিন্তু আসল জামদানির ধারে কাছে আসিতে পারে নাই সেইগুলি। এইরূপই এক ঘটনায় শীতলক্ষ্যা অববাহিকা হইতে একঘর জামদানি তাঁতি অন্ধ্রপ্রদেশের উপ্পাধ্যা এলাকায় গিয়া বসবাস করিতে শুরু করে, সেইখানে উত্পাদিত হইতে থাকে উপ্পাধ্যা জামদানি। ভারত তাহাকেই উত্স ধরিয়া আন্তর্জাতিক এক চুক্তির আওতায় 'ভৌগোলিক নির্দেশক' (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনস) আইন করিয়া পণ্যটির পেটেন্ট বা স্বত্ব নিজেদের হিসাবে নিবন্ধন করিয়াছে। এতে পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দর-কষাকষি হইতে মেধাস্বত্ব লাভ করিবার পথ উন্মুক্ত হইয়াছে দেশটির জন্য। কাগজপত্রে জামদানির মালিকানা এখন তাহাদেরই।

কেবল জামদানি নহে, ফজলি আম, হলুদ, নিম হইতে নকশিকাঁথা পর্যন্ত ৬৬টি পণ্য ও প্রাণীর স্বত্ব নিজেদের বলিয়া নিবন্ধন করিয়াছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এখন তাহারা রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও ইলিশ মাছের মেধাস্বত্বের জন্যও আবেদন করিয়াছে। উপরন্তু, আমাদের ঢিলেমির সুযোগে নাগা মরিচ, কয়েকশত প্রজাতির ধান এবং বেগুনের পেটেন্ট করাইয়া লইয়াছে ভারত, আমেরিকা, ব্রিটেন ও আফ্রিকানরা। আমরা এখন এমন এক বিশ্বে বাস করিতেছি যেখানে স্থানীয় যেকোনো ঐতিহ্য, পণ্য ও সম্পদের অধিকার বা স্বত্ব নিজস্ব বলিয়া দাবি করিতে আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃৃতি আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তত্ত্বাবধান ও উদারীকরণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২৩টি চুক্তির একটি হইতেছে, বাণিজ্য-সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার চুক্তি বা ট্রিপস (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস)। উক্ত চুক্তির ২৭.৩ (খ) ধারায় পৃথিবীর সকল প্রাণ-প্রকৃতি-প্রক্রিয়ার উপর পেটেন্ট করিবার বৈধ অধিকার রাখা হইয়াছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসকল প্রাকৃতিক, মানুষের তৈরি এবং কৃষিজাত পণ্য দীর্ঘকাল ধরিয়া উত্পাদিত হইয়া আসিতেছে তাহার উপর সংশ্লিষ্ট দেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক আইন পাশ করিয়া নিবন্ধন করিবার বিধান রহিয়াছে। ভারত ১৯৯৯ সালেই আইনটি প্রণয়ন করিয়া বাংলাদেশের জামদানি, ফজলি আম, নকশী কাঁথাসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যগত সম্পদের স্বত্ব নিজেদের নামে নিবন্ধন করাইয়া লইয়াছে।

কিন্তু, দুঃখের কথা হইল মেধাস্বত্ব সংস্থায় নিবন্ধনের জন্য এবং ভারতের দাবির বিরুদ্ধে নালিশ জানাইবার উপযুক্ত জাতীয় 'ভৌগোলিক নির্দেশক' আইন আমাদের নাই। ২০০৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় নিজস্ব ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের সুরক্ষার জন্য 'ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সংরক্ষণ) অধ্যাদেশ, ২০০৮' নামক একটি খসড়া প্রণয়ন করিলেও তাহা আইন হিসাবে এখনও পাস করা হয় নাই। কিন্তু জামদানিসহ নিম, হলুদ, ইলিশ ইত্যাদি পণ্য এবং রয়েল বেঙ্গলের স্বত্ব দাবি করিতে হইলে অবিলম্বে খসড়া আইনটি পাস করা দরকার। সম্ভব হইলে এই শীতকালীন অধিবেশনেই। আশার কথা হইল, ভারতের এই নিবন্ধনের বিরুদ্ধে মামলা করিবার সুযোগ আছে। বাসমতী চাউল যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নামে নিবন্ধন করানোর পর তাহা লইয়া মামলা হইয়াছে। ইহার স্বত্ব এখন ভারত ও পাকিস্তানের পাওনা। তাই আমাদেরও হতাশ না হইয়া দ্রুত আইনটি পাস করিয়া ডব্লিউআইপিও এবং ডব্লিউটিওতে জামদানির ব্যাপারে ভারতের দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিবন্ধন করিতে হইবে। পাশাপাশি, সকল দেশজ পণ্য এবং প্রজাতির একটি তথ্যভাণ্ডারও গড়িয়া তুলিয়া আইনের আওতায় নিবন্ধন শুরু করিতে হইবে। অন্যথায়, আমরা নিজেদের পায়েই কুঠারাঘাত করিব; অনেক দেশীয় সম্পদ অন্যের নামে নিবন্ধিত হইয়া যাইবে।


http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=...FfOTgxMQ%3D%3D
__________________
And Allah Knows the best
Reply With Quote