BanglaCricket.com: Article


Tuesday, November 21, 2017
Updated: Saturday, March 10, 2007
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ৭ জন ব্যাটসম্যানের কথা

সৈয়দ ইরতেজা আলী
 
দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর চলে গেল। আর মাএ কয়েক দিন পরে বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। সবাই উত্তেজিত, আনন্দিত, শিহরিত। বিশ্বকাপে ১৬টি দল থাকলেও আমাদের কাছে একটাই দল আছে, সেটা হল বাংলাদেশ। সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন: বাংলাদেশ কেমন খেলবে?

বছর দুয়েক আগেও সবাই মনে করত বাংলাদেশ বিশ্বকাপের সুপার ৮ এ উঠতে পারবে না। কিন্তু দুই বছরে বুড়িগঙ্গার অনেক জল গড়িয়েছে, অনেক ফুল ফুটেছে, কিন্তু এখন অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমাদের বাঘরা যে কোন দিন যে কোন স্থানে, যে কোন দলকে হারাতে পারে। এখানে আমি বাংলাদেশের ৭ জন দামাল ছেলে সম্পর্কে আমার একান্ত মন্তব্য করছি।

শাহরিয়ার নাফিস:

বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের যে নবযুগের সূচনা হয়েছে তার পথিকৃৎ। খুবই জনপ্রিয় ক্রিকেটার। বাংলাদেশের ইনিংস সূচনা কে করবে এই নিয়ে চিরন্তন প্রশ্নেরও উত্তর তিনি। খুব অল্প সময়ে অনেক সাফল্য লাভ করেছেন। কয়েক দিন আগেও সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান ১২৩ এর রেকর্ডটি তার নামের পাশে ছিল। বাংলাদেশের প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার পুরষ্কারটা গত বছর তার অধিকারে। মাত্র ২৯টি ম্যাচ খেলে এক হাজারি ক্লাবের মেম্বার। তার ৪টি শতকের তিনটি জিম্বাবুয়ে ও একটি বারমুডার বিপক্ষে। বড় দলের বিপক্ষেও সমান পারদর্শী; ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার সাথে তার করা ৭৫ রানের ইনিংসটার কথা অনেকেরই মনে আছে। তবে আমার দেখা নাফিসের সেরা খেলাটা ছিল বাংলাদেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ১ম টেস্টের প্রথম দিনটি। সেদিন শেন ওয়ার্ন আর বাকি বোলারদের বিরদ্ধে নাফিসের করা ১০০ রানের ইনিংসটি আমাদের সব সময় মনে থাকবে। ওটা আমার দেখা কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের সব থেকে ভাল ইনিংস।

জাভেদ ওমর বেলিম:

আমাদের অভিজ্ঞ ওপেনিং খেলোয়াড়। তার মত এত সুযোগ আর কোন খেলোয়াড় পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। এক দিনের খেলায় তার কচ্ছপ গতির খেলা নিয়ে অনেকেই বিরূপ সমালোচনা করেন। তার ডাক নাম গোল্লা হবার কারনে উনি খালি গোল্লা মারেন - এই যুক্তিতে অনেক কষ্টে নাম গোল্লা থেকে গুল্লু করেছেন, তবে তাতেও তেমন লাভ হয়নি। এতদিন ধরে খেলেন তারপরও তার ব্যাটিং গড় মাত্র ২৩.৭৯। ৫৩টি খেলা খেলে ৬০ এর উপর রান করতে পেরেছেন মাত্র ৪ বার। তাও ২ বার করেছেন হংকং আর জিম্বাবুয়ের সাথে। কিন্তু পরিশ্রমী ফিল্ডার হিসেবে তার সুনাম আছে। দলকে অনুপ্রেরণা দিতে পারেন। আমি শুনেছি জাভেদের নাকি অনেক বন্ধু, চাঁদের দেশে গেলেও তার দুই তিনটা বন্ধু পাওয়া যেতে পারে। খবরের কাগজে পড়লাম, তার এক বন্ধু হুমায়ুন ফরিদী নাকি তাকে বলেছেন, ‘জাভেদ যতবার হাফ সেঞ্চুরি করবে, তাকে ততবার একটা করে শার্ট উপহার দেয়া হবে’। কিন্তু জাভেদ ভাইয়ের কপালে জামা আছে বলে মনে হয় না, পানির বোতল নিয়া মাঠে ছুটে চলা ছাড়া তার আর কোন ছবি আমার চোখে ভাসে না।

তামিম ইকবাল:

আমি চট্টগ্রামে থাকার কারণে তার প্রতিভার খবর অনেক আগেই পেয়েছিলাম। ওকে আমি প্রথম দেখি চট্টগ্রামের কাজির দেউড়ির একটা খাবার হোটেল ‘মদিনা’-তে। আকরাম খানের পারিবারিক দোকান ছিল ওটা। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল তামিমের সাথে। ইকবাল ভাইয়ের ছেলে আর আকরাম ভাইয়ের ভাতিজা হিসাবে। আমার বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, এই ছোট্ট ছেলেটা খুব ভাল খেলে। বাঁ হাতে খেলে এবং অনেক অ্যাটাকিং। তামিম নাকি জন্মের পরে হাঁটার আগেই ব্যাটিং করা শিখে ফেলেছে। তার থেকে বড় সাইজের একটা ব্যাট নিয়ে তামিম বারান্দায় ছুটে চলে, মনে হয় রানিং বিটুইন দ্য উইকেট অনুশীলন করে। কে জানি বলছিল, আগুন যেমন চাপা থাকে না তেমন ট্যালেন্টও কোন দিন চাপা থাকে না। সেদিন থেকে আমি অপেক্ষা করছি, কবে তামিম বড় হবে, বাংলাদেশের হয়ে খেলবে। কিন্তু ওর আগমনটা হল অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে, একদম বিশ্বকাপের আগে। আমরা মনে করেছিলাম মেহরাব জুনিয়র নাফিসের সাথে বিশ্বকাপে খেলবে। তামিমের শুরুটা খুব একটা ভাল হয়নি, ৪ টি খেলায় ৫৩ রান এরকম কিছু না। কিন্তু তাকে আরও অনেক সুযোগ দিতে হবে। আমরা সবাই আশা কবি ভারত বা শ্রীলংকার সাথে তামিমের ব্যাটে আগুন ঝরুক।

আফতাব আহমেদ:

আমাদের চট্টগ্রাম থেকে আরেকজন ক্রিকেটার। আমি আফতাবকে প্রথম দেখি নাসিরাবাদ স্কুলের নেটে। তখনি ওর অনেক নাম ডাক। এই ছেলেটা নাকি খুব ভাল খেলে, খুবই মারকুটে, ছক্কা মারতে খুব পটু। আফতাব যখন মাঠে খেলে, তখন কেউ নাকি ভয়ে মাঠের আশ পাশ দিয়ে হাটাহাটি করে না। বলা যায় না কখন আফতাবের ছক্কার বল মাথায় পড়ে! আফতাবের ছক্কার চোটে নাসিরাবাদ স্কুলের বিল্ডিং এর দেয়ালে দেয়ালে ফাটল ধরে গেল। এখন সেই আফতাব খেলে ওয়ান ডাউনে। আমার মতে দলের সেরা ব্যটসম্যান খেলে ৩ নম্বরে। আফতাবের বর্তমান ফর্মে আমি নিশ্চিত, কেউ ব্যাপারটাতে আপত্তি করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রতিটি জয়ে আফতাবের ভুমিকা আছে। বলেও আফতাব অনেক কার্যকরী। তার সেরা বোলিং ফিগারটা নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে ৫-৩১। ভারতের সাথে সেই ৬৭ রানের ম্যাচ জয়ী ব্যাটিং থেকে শুরু। অস্ট্রেলিয়ার সাথে সোফিয়া গার্ডেনে, ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে শেষ ওভারে গিলেস্পিকে মারা সেই বিশাল ছক্কাটা এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সাক্ষী। T-A-K-E T-H-A-T AUSTRALIA। এবারের বিশ্বকাপে সুপার ৮-এ উঠতে হলে আফতাবের ব্যাটিঙে রান পেতেই হবে।

সাকিব-আল-হাসান:

অস্ট্রেলিয়ার আছে মাইকেল হাসি, ভারতের আছে রাহুল দ্রাবিড় আর আমাদের বাংলাদেশের আছে সাকিব-আল-হাসান। আমাদের একটা বড় অভিযোগ ছিল যে, বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান ধারাবাহিক নন। একটা খেলায় রান করলে, পরের তিনটা খেলায় তারা রান করেন না। সাকিব আসার পর এই অপবাদটা দূর হল। তার ব্যাটে রয়েছে অসাধারণ ধারাবাহিকতা। অনূর্ধ ১৯ দলে তার খেলা দেখেই সবাই আশার আলো দেখতে পেল। নাফিস, মেহরাব, তামিম, এবং নাজমুস সাদাতের পরে সাকিব-আল-হাসান। বাঁ হাতি ক্রিকেটারদের যেন বিপ্লব শুরু হয়েছে আমাদের টিমে। বাংলাদেশের হয়ে এক দিনের খেলায় ব্যাক্তিগত সর্ব্বোচ্চ রান ১৩৪ (অপরাজিত) এর রেকর্ড তার মুকুটে। তার বর্তমান ব্যাটিং গড় ৫৫.২৫, যেটি সর্বকালের এক দিনের খেলার তালিকাতে তিন নাম্বারে। দলের প্রয়োজনে চীনের প্রাচীরের মত উইকেট আগলে রাখেন, একজন মেধাবী অলরাউন্ডার, ভাল ফিল্ডিং-ও করেন।

হাবিবুল বাশার:

বাংলাদেশ দলের সব থেকে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। বয়স তিরিশের কোঠায়, এটাই হয়ত তার শেষ বিশ্বকাপ। কয়েক দিন আগে তার ১০০তম এক দিনের আন্তর্জাতিক খেলাতে, বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় হিসাবে দুই হাজারি ক্লাবের সদস্য হলেন। বাশার ১৪ বার পঞ্চাশের ঘর পার করলেও একবারও ১০০ রান করতে পারে নি, তাই অনেকে তাকে ডাকেন মিস্টার হাফ সেঞ্চুরি। বাশার বাংলাদেশ টেস্ট দলের ৪র্থ অধিনায়ক। তার দল পরিচালনা নিয়ে অনেকে আলোচনা, সমালোচনা করেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ী অধিনায়ক হিসাবে তার নামটা সব সময় নিতে হবে। তবে চাপের মুখে ভাল খেলতে পারেন। এক দিনের খেলা থেকে টেস্টে ব্যাটসম্যান হিসাবে বেশি সফল। এক দিনের খেলায় জিম্বাবুয়ে ছাড়া অন্য বড় দলের বিরুদ্ধে তার ৬০ এর উপর রান মাত্র একবার। ৭০ রানের সেই ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়ার সাথে ফতুল্লাতে, তবে অস্ট্রেলিয়ার সাথে সোফিয়া গার্ডেনে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে আশরাফুলকে ভাল সহায়তা দিয়েছেন। ১০০তম ম্যাচ খেলার পর তার ব্যাক্তিগত গড় মাত্র ২২.৪৪।

মোহাম্মদ আশরাফুল:

বাংলাদেশের খেলাপ্রেমী বা ক্রিকেট পাগলদের সারা বছরের আলোচনার টপিক হল আশরাফুল। সে না থাকলে আমদের ক্রিকেটটাই বিরক্তিকর হয়ে যেত। তাকে নিয়ে চিন্তায় চিন্তায় অনেকের মাথার চুল পেকে গেছে। সাংবাদিকরা লিখতে লিখতে কলমের কালি শেষ করে ফেলেছেন। সবার একটাই কথা - আশরাফুলের ব্যাটে রান নেই কেন? তাকে কি দলে রাখা উচিত না বাদ দেয়া উচিত? এক সময় মেহরাব অপি, পরে কিছুদিন অলক কাপালি, আর এখন আশরাফুল নাকি অনেক মেয়ের রাতের ঘুম কাড়েন। কিছুদিন আগে মডেল মোনালিসার সাথে আমাদের আশরাফুলের বিশাল হাসি মাখা ছবি দেখলাম। বাহ! তবে তার অনেক অজানা গুণ জানতে পারলাম । আমাদের আশরাফুল নাকি টিমের জোকার, ঠাট্টা তামাশা করে উনি সবাইকে খুশি রাখেন। এটা একটা খুবই জরুরি বিষয়, খেলার আগে সবাইরে হাসালে সবার মন ভাল থাকে, খেলার সময় মানসিক চাপ কমে। সুতরাং রান না পেলেও, তার এই জোকারি প্রতিভার কারণেও তাকে দলে রাখা যায়। আর উনি মাঝে মাঝে রাতে স্বপ্নে দেখেন সব বোলারদের পিটাইয়া পিটাইয়া পোতাইয়া ফেলছেন। একবার তার পোতানি খেয়েছে অস্ট্রেলিয়া ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে বাংলাদেশর সেই ঐতিহাসিক জয়ে । সেই খেলায় আশরাফুল ১০১ বলে ১০০ রান করে ছিল জয়ের নায়ক। এর পরে ইংল্যাণ্ডও নটিংহামে আশরাফুলের ঝড়ে উড়ে যেতে বসেছিল, ৫২ বলে ৯৪ রান। সেদিন আশরাফুলের চারের পর চার, ছক্কার পর ছক্কা দেখে ইংল্যাণ্ড বোলাররা মাঠের মধ্যেই কান্না কাটি শুরু করে দিল। কিন্ত সেই আশরাফুল কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। ৮৮ টা ম্যাচ খেলার পরও তার ম্যাচ গড় মাত্র ২১ এর আশে পাশে। পরে কে একজন জানাল বছরে যেমন ঈদ আসে দুইদিন, তেমন আশরাফুলের ব্যাটে রানও আসে বছরে দুই দিন। আমরা আশা করি আশরাফুলের ঈদ ফিরে আসুক ১৭ তারিখ ভারতের সাথে বিশ্বকাপের খেলায়।